তারল্য সংকট ও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির প্রভাবে দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪-১৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এ রকম উচ্চ সুদের প্রভাবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ তলানিতে নেমে এসেছে। খেলাপি ঋণের হারও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি কমাতে ব্যবসায়ী নেতারা ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অংকের ঘরে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই), বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনসহ (বিটিএমএ) বিভিন্ন সংগঠনের ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে এ দাবি জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গতকাল দুপুরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ডেপুটি গভর্নর ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে এফবিসিসিআই মহাসচিব মো. আলমগীর বলেন, ‘বর্তমানে দেশে সুদহার ১৪ শতাংশের ওপরে। অথচ পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা মুনাফাই করে ১০-১১ শতাংশ। সুদের এ হার কোনো অবস্থাতেই ব্যবসাবান্ধব নয়। এ উচ্চ সুদের কারণে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা, বিনিয়োগের স্বার্থে ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার ক্রমান্বয়ে কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে আনার অনুরোধ জানিয়েছি। এ সময় গভর্নর জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি কমে আসা সাপেক্ষে নীতি সুদহার এক অংকে নেমে আসবে। আগামী মুদ্রানীতিতেই এ বিষয়ে ঘোষণা থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার মেয়াদ সেপ্টেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। সেটা আরো ছয় মাস বাড়ানোর কথা বলেছি। একই সঙ্গে ৫০ কোটি টাকার নিচের ঋণ পর্যালোচনাপূর্বক নীতিসহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে পৃথক আরেকটি কমিটি গঠনের জন্য প্রস্তাব করেছি। এ ক্ষেত্রে গভর্নর জানিয়েছেন, সমস্যা হবে না।’
বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা রফতানিমুখী শিল্পের ব্যাংকিং সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের দাবি জানান। এ বিষয়ে এফবিসিসিআই মহাসচিব বলেন, ‘রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে, যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান হওয়া জরুরি। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে উচ্চ পর্যায়ের একটি বিশেষ কমিটি করা যেতে পারে। এতে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএসহ রফতানি-সংক্রান্ত অন্য বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এ বিষয়ে গভর্নর রাজি হয়েছেন। একজন ডেপুটি গভর্নরকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তার সঙ্গে এখন আমরা এসব বিষয়ে আলাপ করতে পারব।’
বৈঠকে অংশ নেয়া ব্যবসায়ীরা জানান, কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার ৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়েছিল। কিন্তু এ তহবিল এখন ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ব্যবসায়ী নেতাদের পক্ষ থেকে ইডিএফের আকার বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
এফবিসিসিআই মহাসচিব মো. আলমগীর ছাড়াও গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে সংগঠনটির সাবেক সহসভাপতি আবুল কাশেম হায়দার ও নিজাম উদ্দিন রাজেশ, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও সাবেক সভাপতি এসএম ফজলুল হক, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আব্দুল হক, গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী (খোকন), আব্দুল ওয়াহেদ, আনোয়ার হোসেন ও মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন, বাংলাদেশ সিএনজি মেশিনারিজ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. জাকির হোসেন (নয়ন) এবং বাংলাদেশ সুপার মার্কেটস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন উপস্থিত ছিলেন।